আওয়ামী লীগ আমলে রাজনৈতিক নেতাদের ইস্যুকৃত অস্ত্র
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইস্যুকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পর্যালোচনার ঘোষণা দিয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ওই সময়ে দেওয়া লাইসেন্সগুলো ‘রাজনৈতিক বিবেচনায়’ দেওয়া হয়েছিল কি না বা ‘নীতিমালা বহির্ভ‚ত’ ছিল কি না তা যাচাই করা হবে। সে হিসেবে নারায়ণগঞ্জে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি দলের বিভিন্ন নেতাকর্মীদের নামে ইস্যু করা আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নিয়ে ফের আলোচনা উঠে আসছে। এছাড়া সেই প্রসঙ্গের জের ধরে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্যে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে দলবল নিয়ে হামলা চালায় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও তার অনুসারীরা। তবে জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে শামীম ওসমান সহ তার লোকজন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। ফলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের লাইসেন্স করা অস্ত্র ফের আলোচনা শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক দলের অনেক নেতাকর্মী বিগত আওয়ামী লীগ আমলে দলের প্রভাব খাটিয়ে অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছেন। তবে সেই তালিকায় নারায়ণগঞ্জের কারা রয়েছেন তা এখনো জানা যায়নি। তদন্ত শেষে তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হবে। যদিও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িতদের বিষয়ে অনেকে প্রভাব খাটিয়ে অস্ত্রের লাইসেন্স নেওয়া হয়েছে বলে বোদ্ধামহল মনে করছেন।
গত রবিবার (১ মার্চ) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এক সভায় বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের মধ্যে ইস্যু করা অস্ত্রের লাইসেন্স যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় বা নীতিমালা বহির্ভ‚তভাবে দেওয়া হয়ে থাকে, সেগুলো চিহ্নিত করে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দিতে হবে। এ লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এর আগে, জুলাই বিপ্লবের পর গত ৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা থাকলেও নারায়ণগঞ্জ জেলায় অন্তত ৫৫টি আগ্নেয়াস্ত্র জমা পড়েনি। এরমধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান ও তার পরিবারের সদস্যদের কাছে রয়েছে অন্তত আটটি আগ্নেয়াস্ত্র, যা তারা জমা দেননি। এসব অস্ত্র অবৈধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসন স‚ত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলায় ৭৩৭টি অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত টানা চার মেয়াদে মোট ৩২১টি অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।
অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে দেওয়া ১৯১টি অস্ত্রের লাইসেন্স স্থগিত করেছে জেলা প্রশাসন। এরমধ্যে ১০২টি শটগান ও বন্দুক, ৬৭টি পিস্তল, ১৪টি রাইফেল ও আটটি রিভলভার। এই সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে জেলার বিভিন্ন থানায় ১৩৬টি অস্ত্র জমা দেওয়া হয়েছে। এখনো ৫৫টি অস্ত্র জমা পড়েনি।
অস্ত্র জমা না দেওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছেন শামীম ওসমান, তার ভাই সেলিম ওসমান, ছেলে ইমতিনান ওসমান অয়ন ও শ্যালক তানভীর আহম্মেদ টিটু। অস্ত্র জমা না দেওয়ার তালিকায় নাম রয়েছে এই আসনের প্রয়াত সংসদ সদস্য সারাহ বেগম কবরীরও।
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৮ অক্টোবর শামীম ওসমানের নামে পয়েন্ট ২২ বোরের একটি রাইফেলের লাইসেন্স দেওয়া হয়। তিনি এই রাইফেলের লাইসেন্স একই বছরের ৩১ ডিসেম্বর নবায়নও করেছেন। এছাড়া ওই বছরের ২৬ অক্টোবর একটি এনপিবি পিস্তলের লাইসেন্স নেন তিনি। কিন্তু অন্তর্র্বতী সরকারের ঘোষণার পর বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে তিনি অস্ত্র দুটি জমা দেননি। সেই কারণে তার অস্ত্র দুটি অবৈধ হিসেবে বর্তমানে জেলা প্রশাসনের তালিকায় তালিকাভুক্ত হয়েছে।
তার ভাই নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম সেলিম ওসমানও তার আগ্নেয়াস্ত্র জমা দেননি। ২০২০ সালের ১ মার্চ তার নামে একটি পিস্তল ইস্যু করা হয়। তার নামে ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আরেকটি পিস্তলের লাইসেন্সও দেওয়া হয়।শামীম ওসমানের ছেলে ইমতিনান ওসমান অয়ন এখনো তার শটগানটি জমা দেননি। তার শ্যালক ও বিসিবির সাবেক পরিচালক তানভীর আহম্মেদ টিটুর নামে ২০১৫ সালের ১৫ নভেম্বর পয়েন্ট ২২ বোরের একটি রাইফেলের লাইসেন্স দেওয়া হয়। গত বছরের ৫ নভেম্বর পয়েন্ট ২২ বোরের একটি এনপিবি পিস্তলেরও লাইসেন্স পান তিনি। এসব অস্ত্র সহ শামীম ওসমানের বেয়াই (ছেলের শ্বশুর) ফয়েজউদ্দিন আহমেদ লাভলুও তার লাইসেন্সপ্রাপ্ত শটগানটি এখনো জমা দেওয়া হয়নি।
চব্বিশের ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জ শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালিয়েছিলেন শামীম ওসমান ও তার বাহিনী। তার নেতৃত্বে বাহিনীর সদস্যদের গুলি করার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে। ওইদিন শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন, শ্যালক টিটু, বেয়াই লাভলু, তার ছেলে মিনহাজুল আবেদীনসহ বাকি অনুসারীদের গুলি করতে দেখা গেছে।
শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিত মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম ও যুবলীগের ক্যাডার নিয়াজুল ইসলাম খানও সেদিন গুলি চালান। এর আগে, ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি হকার ইস্যুকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে লক্ষ্য করে গুলি চালান নিজাম ও নিয়াজুল। এই ঘটনায় দায়ের করা মামলা থেকে তাদের দুজনকে পুলিশ অব্যাহতি দিলেও গত বছরের সেপ্টেম্বরে নিয়াজুলের পিস্তলের লাইসেন্স বাতিল করেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মাহমুদুল হক।
এছাড়া শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরী ওসমান ও তার বাহিনীর কাছেও একাধিক অবৈধ অস্ত্র রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। প্রায়ই তারা অস্ত্র হাতে শহরে মহড়া দিতেন। যদিও আজমেরী ওসমানের কোনো অস্ত্রের লাইসেন্স ছিল না। গত বছর তিনি জেলা প্রশাসনের কাছে একটি শটগান ও পিস্তলের লাইসেন্সের আবেদন করলেও অনুমোদন পাননি।
অন্যদিকে, সারাহ বেগম কবরীর নামে ২০১৩ সালের ২৭ মে একটি রিভলভারের লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। এটি বর্তমানে জেলা প্রশাসনের অবৈধ ঘোষিত তালিকায় রয়েছে।
অস্ত্র জমা না দেওয়ার তালিকায় আছেন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, তার স্ত্রী তারাব পৌরসভার সদ্য সাবেক মেয়র হাছিনা গাজী, বড় ছেলে গাজী গোলাম ম‚র্তজা ও ছোট ছেলে গাজী গোলাম আসরিয়াও। ২০১৭ সালে তাদের নামে চারটি শটগানের লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। তাদের নামে পিস্তলের লাইসেন্সও ছিল। পিস্তলগুলোও তারা জমা দেননি।
রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতা ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আরিফুল হক ভ‚ঁইয়াও তার নামে ইস্যু করা পয়েন্ট ২২ বোরের পিস্তলটি জমা দেননি। তিনি ২০১৩ সালের ৪ এপ্রিল অস্ত্রটির লাইসেন্স পেয়েছিলেন। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর এটি নবায়নও করেন।
অস্ত্র জমা দেননি রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান ও রংধনু গ্রæপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামও। তার নামে ২০১২ সালের ২২ জানুয়ারি আগ্নেয়াস্ত্রটি ইস্যু করা হয়। তিনি সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর অস্ত্রটির লাইসেন্স নবায়ন করেছিলেন। তার নামে ২০১২ সালের ২৮ মে একটি পিস্তলের লাইসেন্স দেওয়া হয়। এটিও তিনি জমা দেননি।
অস্ত্র জমা দেননি জাতীয় পার্টির নেতা ও ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন। তিনি মুন্সিগঞ্জ জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি। নারায়ণগঞ্জ জেলা থেকে তার নামে ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল একটি শটগানের লাইসেন্স দেওয়া হয়।
আগ্নেয়াস্ত্র জমা দিয়েছেন যারা
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর গত ১৫ বছরে নারায়ণগঞ্জে যাদের অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল, তাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী কিংবা তাদের ঘনিষ্ঠজন। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী আত্মগোপন করেন। নেতাদের মধ্যে অনেকে বিদেশে পালিয়ে গেছেন বলে খবর রয়েছে। তবে অনেকে তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে থানাগুলোতে অস্ত্র জমা দিয়েছেন।
অস্ত্র জমা দেওয়ার তালিকায় আছেন ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল। তার নামে থাকা এনপিবি পিস্তলটি তিনি জমা দিয়েছেন। ২০১৬ সালের ২৭ মার্চ তিনি এটির লাইসেন্স পান।
আগ্নেয়াস্ত্র জমা দিয়েছেন বন্দর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জাতীয় পার্টির নেতা এহসানউদ্দিন আহমেদ। তার নামে পয়েন্ট ২২ বোরের একটি রাইফেলের লাইসেন্স ছিল।
সোনারগাঁ উপজেলার সনমান্দি ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জাহিদ হাসান জিন্নাহ তার পয়েন্ট ৩২ বোরের রিভলভারটি জমা দিয়েছেন। গত ২০১৩ সালের ১১ নভেম্বর তিনি অস্ত্রটির লাইসেন্স পান। তবে তার নামে থাকা একটি বন্দুকও রয়েছে, সেটি তিনি জমা দেননি। ২০০৯ সালের ১২ জানুয়ারি আগ্নেয়াস্ত্রটির লাইসেন্স পেয়েছিলেন তিনি।
আড়াইহাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও গোপালদী পৌরসভার সদ্য সাবেক মেয়র এম এ হালিম সিকদার তার শটগানটি জমা দিয়েছেন। তাকে ২০১১ সালের ২২ ডিসেম্বর অস্ত্রটির লাইসেন্স দেওয়া হয়। তার নামে ইস্যু হওয়া পিস্তলটিও তিনি জমা দিয়েছেন।
জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম আবু সুফিয়ান তার পয়েন্ট ৩২ বোরের পিস্তল জমা দিয়েছেন। ২০১০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর লাইসেন্স পান তিনি।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত যুবলীগ নেতা অ্যাডভোকেট মোহসীন মিয়া তার শটগানটি জমা দিয়েছেন। তিনি ২০২২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর অস্ত্রটির লাইসেন্স পান। ২০২১ সালের ১৮ মার্চ একটি এনপিবি পিস্তলের লাইসেন্স নেন তিনি। সেটিও জমা পড়েছে।
শামীম ওসমানের স্ত্রীর চাচাত ভাই ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এহসানুল হাসান নিপু তার শটগানটি জমা দিয়েছেন। ২০১৩ সালের ২২ আগস্ট তিনি সেটির লাইসেন্স পান। ২০১৮ সালের ২৬ আগস্ট তিনি একটি পিস্তলের লাইসেন্স নেন। এটিও তিনি জমা দিয়েছেন।
অস্ত্র জমা দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু, ছয় নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মতিউর রহমান ও আট নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রুহুল আমিন। তাদের তিনজনের নামেই শটগানের লাইসেন্স ছিল। আব্দুল করিম বাবু তার পিস্তলটিও জমা দিয়েছেন। ২০১১ সালের ১ নভেম্বর তিনি পিস্তলটির লাইসেন্স পেয়েছিলেন।
রূপগঞ্জ উপজেলার মুড়াপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান তোফায়েল আহমেদ আলমাছ তার শটগানটি জমা দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে অন্তত তিনটি হত্যা মামলা থাকলেও ২০১৩ সালের ফেব্রæয়ারিতে আগ্নেয়াস্ত্রটির লাইসেন্স পান তিনি। নিজের লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র ছাড়াও অস্ত্রধারী তিন বডিগার্ড নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন আওয়ামী লীগের এই নেতা।
মতামত দিন